Newsbazar24.com / দেশ

  • শব্দনৈঃশব্দ্যে দিলীপ তলয়ার

    21-May-18 02:28 pm



    ছেলেবেলায় চটজলদি লিখে ফেলা শব্দের কিছু কারুকার্য প্রায় সকল স্বাভাবিক মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। যেখানে ছবি হোক বা কবিতা, তার বিষয় ঘিরে থাকে মূলত প্রকৃতির সৌন্দর্য আর খানিকটা প্রেম এবং সেই দুইয়েরই এক টানটান শব্দবুনোট, যেখানে সে সময়ের বালখিল্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে টাইম ক্যাপসুল প্রস্তুত করে। তারপর বয়স বাড়ার হাতছানিতে সেসব অকাল সৃষ্টি কোথায় লুকিয়ে পড়ে তার হদিশ মেলা ভার। সময়ের এই নির্মোঘ নিয়ম ভেঙে কেউ কেউ হয়তো তার বালখিল্যের অপুষ্টিকে পুষ্ট করার তাগিদে সকলের থেকে পিছু হটে খুঁজে ফেরে বিচিত্র আদিম সত্তার অত্যাশ্চর্য কিছু ফর্মুলা। মরা বাঁচার মাঝের রসদটুকু চিনিয়ে দেন অন্ধকারাচ্ছন্ন গভীর জঙ্গলে গাঢ় সবুজের মাঝে এক নিবিড় ছায়া---কবি দিলীপ তলয়ার।

     

    কবি জন্মগ্রহণ করেন মালদায় ১৯৫৭ সালের ২০ শে সেপ্টেম্বর। যৌবনের অদ্ভুত আবেগে তাড়িত হয়ে তিনি খোঁজে নামেন নাট্যদলের। নাট্যজীবন নিয়ে যে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট নন বা বলা ভালো স্বতঃস্ফূর্ত নন ভেবেই ফিরে আসেন ছেলেবেলায় হারিয়ে যাওয়া কবিতার পুনরুজ্জীবনে। শুরু করেন কবিতার যাত্রাপথ। জীবনের নানাবিধ কষ্ট কোনও মানুষকে যে কতখানি শুভ দিকে পরিচালিত করতে পারে তার জলজ্যান্ত দলিল হয়ে মন দেন কবিতা আর কর্মজীবনে। জীবনের শেষ দিকে তিনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত গ্রামীণ ব্যাঙ্কে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কোনওটাতেই তিনি একে অপরকে সরাসরি প্রভাবিত করতে বরাবরই নারাজ। তাই শত কষ্টের মাঝেও সত্তরের দশকে শুরু করেন নিভৃতে কবিতা যাপন। ধীরে ধীরে লেখা ছাপার জন্য বেছে নেন লিটল ম্যাগাজিন গুলোকে। তারপর সাহিত্য জগতে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হন মালদা সাহিত্য পরিষদে। সেখানে সাধারণ সদস্য থেকে ক্রমে সম্পাদক মণ্ডলী, যুগ্ম সম্পাদক এবং শেষে সম্পাদকের কাজ করেন। সাল ১৯৮৮ র জুন প্রকাশ পায় কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিসর্গের দিকে’।

     

    এরপর তিনি আর থেমে থাকেননি। নিয়মিত প্রকাশ করে গেছেন তাঁর লেখা কবিতার বই। প্রকাশ পায় পরপর, ‘নিসর্গের দিকে’, ‘সময়ে মানুষ উঠে দাঁড়ায়, রুখে দাঁড়ায়’, ‘সাতে সমুদ্র’, ‘তোমার ঠিকানা’, ‘কাঠের মঞ্চ শীতের ভাষা’, ‘পাথর, উড়ন্ত তাস এবং সলমা জরি’, ‘ও পরমার্থ ও গাছপালা’, ‘নীলসময়েরকুহুগান’, ‘আধেকলীন’, ‘শূন্য থেকে শুরু হলে’, ‘মাধুরীমূলক’, ধূলি ধুসরিত’, ‘জয়ধ্বনি’ এবং ‘কী আশ্চর্য ইঙ্গিত’।

     

    এরই ফাঁকে কখনও একা আবার কখনও যৌথভাবে সম্পাদনা করেন বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন। সাল ১৯৮৩ র সেপ্টেম্বর। ‘দশে দিক’ লিটল ম্যাগাজিন প্রথম তাঁর সম্পাদনার ফসল। তিনি মূলত কবিতাকেন্দ্রিক পত্রিকাই সম্পাদনা করেছেন। পরপর প্রকাশ পায় ‘বাল্মীকি’, ‘যুগলবন্দী’, ‘রহিতাশ্ম’, ‘উৎস’, ‘সাম্প্রতিক পত্রিকার তালিকা’, ‘দিন যায়’, ‘উজ্জ্বল উদ্ধার’, ‘শব্দনৈঃশব্দ্য’ এবং শেষে ‘উত্তর আধুনিক’। এখানে ‘সাম্প্রতিক পত্রিকার তালিকা’ এবং ‘উজ্জ্বল উদ্ধার’ লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে প্রকাশ পায়নি, তবে বলা যেতে পারে এই দুটি কাজ মালদা জেলার সাহিত্য জগতের তথ্য একত্রীকরণের প্রাথমিক প্রয়াস। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘শব্দনৈঃশব্দ্য’ র বিশেষভাবে সমাদৃত একটি সংখ্যা/কাজ হলো ‘চারণ কবি বৈদ্যনাথ স্মরণ সংখ্যা’।

     

    দিলীপ তলয়ার জীবনের প্রায় শেষের দিকে কবিতার পাশাপাশি শুরু করেন গল্প লেখা। ব্যক্তিগত অভিমতে এইসকল গল্প অতটা পরিপক্ক নয়, বলা যায় গল্প লেখা শুরুর প্রক্রিয়া। ব্যক্তিগত যোগাযোগে যারা দিলীপদাকে চেনেন তারা সহজেই ঠাহর করতে পারবেন সেগুলো আসলে তাঁর জীবনের জার্নাল। যেখানে চরিত্রগুলো নাম বদলে বসে রয়েছে। প্রকাশিত গল্পের বইগুলো হলো, ‘ডুমডুমির মাঠ’ এবং ‘জীবন্ত মূর্তি অথবা জবাকুসুম’। শেষের বইটি এখনও প্রকাশ পায়নি। অর্থাৎ তাঁর জীবদ্দশায় তিনি বইটি প্রকাশ দেখে যেতে পারেননি। যদিও সেটির মুদ্রণ সম্পূর্ণ হয়ে প্রকাশকের প্রকাশ অপেক্ষায় রয়েছে।

     

    লিটল ম্যাগাজিনেও অজস্র লেখা তাঁর ছড়িয়ে রয়েছে। উত্তরবঙ্গের প্রায় সবকটি পত্রিকা সহ দক্ষিণের পত্রিকা এবং বাংলাদেশ সহ বেশ কিছু প্রবাসী বাংলা পত্রিকাতেও লিখেছেন। এখানে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো, কবি নিজে থেকে যেচে কোথাও লেখা পাঠাতেন না। লেখা চাইলেই কেবল পাঠাতেন। ফলত নামজাদা অনেক পত্রিকা থেকে তিনি দূরে সরে থেকেছিলেন। কিছু পত্রিকায় নাম দেওয়া হলো যেখানে প্রায় নিয়মিতই তিনি লিখেছেন। গৌড়ভূমি, নবজন্ম, বিকল্প, ভিটেমাটি, জোয়ার, আরণ্যক, ধ্রুবজ্যোতি, সূর্যাবর্ত, মুখর, মধ্যবর্তী, সাহিত্য তৃষা, নোনাই, উত্তরের হাওয়া, সৌরিমা, রূপান্তরের পথে সহ অন্যান্য আরও প্রায় একশটি ছোট বড় পত্রিকা।

     

    সাংগঠনিকভাবে মালদা সাহিত্য পরিষদে যুক্ত থেকে দীর্ঘদিন যৌথভাবে কাজ করে তিনি বেরিয়ে পড়েন সেখান থেকে। কারণটা খানিক আদর্শের লড়াই। পরবর্তী সময়ে তিনি মালদার কিছু কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে প্রথম দশকের গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মালদা সাহিত্য উদ্যোগ’।

     

    ডাল-ভাত-সর্ষেমাখা চচ্চড়ি-আলুভাজা প্রিয় এই কবির খাদ্যতালিকাই তাঁকে চিনিয়ে দেয় তাঁর সম্ভাব্য পুরস্কার পাওয়ার ইচ্ছে। হ্যাঁ, তিনি নেহাতই এসবের তোয়াক্কা করতেন না বলেই পেছন থেকে ডাক দিয়ে সামনে সম্মান নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। কিন্ত যেখানে তিনি আমন্ত্রিত এবং সম্মাননা জ্ঞাপনে ডাকা হয় সেখানে তিনি দৃঢ়ভাবে সসম্মানে সম্মান গ্রহণে হাসিমুখেই বিরাজমান থাকেন। পেয়েছেন সীমান্ত সাহিত্য পুরস্কার (২০০৪), আলিপুরদুয়ার মিউজিক কলেজ সম্মান (২০০৬), উত্তরবঙ্গ নাট্যজগত সম্মান (২০০৬), বিপিন চক্রবর্তী স্মৃতি সম্মান (২০০৭), অনিল বর্মণ স্মৃতি সম্মান (২০১১)।

     

    কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণের প্রায় পরপরই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং চিকিৎসার কিছু সমস্যার কারণে শরীরে পূর্বে জমে থাকা বেশ কিছু রোগ ধরা দেয়। ৭ই মে ২০১৮ মালদা মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে দুপুর ১টা ৫০ নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

    সৌজন্যে: Sudipta Das

    Read : 0
    Edit

Related Posts

মালদার ক্যান্সার আক্রান্ত রুগী সাহায্য চায়
আগামী ১৭ই জুন সারা ভারতবর্ষ ব্যপী চিকিৎসা বন্ধের ডাক
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী মোদীর নয়া পরিকল্পনা:
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রধান মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী কি বলেছেন জেনে নিন
নিউসবাজার২৪ এর পক্ষ থেকে সবাইকে অনেক অনেক ঈদের শুভেচ্ছা। "ঈদ মোবারক"
এবারে ভারতবর্ষের লোকসভা নির্বাচনে অর্থ খরচে সর্বকালের রেকর্ড
আজ ১৯শে জৈষ্ঠ, দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ত্রিকালদর্শী মহাপুরুষ বাবা লোকনাথের ১২৯ তম তিরোধান দিবস
জানেন কি নতুন সব আপডেট নিয়ে আসছে পাবজি ?
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বাজেট পেশ আগামী ৫ই জুলাই ।